৪ ‘ক্রসফায়ার’ : একদিনে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে ৩ হত্যা মামলা

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার আসামি টেকনাফের বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে চারজনকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার ঘটনায় আরো তিনটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রদীপ মোট আটটি হত্যা মামলার আসামি হলেন।
আজ বুধবারের তিনটি হত্যা মামলার মধ্যে দুটি কক্সবাজারে এবং একটি চট্টগ্রামের আদালতে দায়ের করা হয়েছে।

কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (টেকনাফ-৩) হেলাল উদ্দীনের আদালতে এই দুই মামলার আবেদন করা হয়েছে। মামলা দুটিতে মোট ৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এর মধ্যে একটি মামলা করেছেন টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাইঙ্গ্যা ঘোনা এলাকার বাসিন্দা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মুছা আকবরের (৩৫) স্ত্রী শাহেনা আকতার। অপর মামলাটি করেছেন একই ইউনিয়নের কাঞ্জরপাড়া এলাকার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত সাহাব উদ্দিনের (৩০) বড়ভাই হাফেজ আহমদ।

পরে আদালত চত্বরে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীরা সাংবাদিকদের জানান, মুছা আকবরের হত্যা মামলায় হোয়াইক্যং ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমানকে প্রধান ও প্রদীপ কুমার দাশকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। আর সাহাব উদ্দিন হত্যা মামলায় উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক বিশ্বাসকে প্রধান এবং ওসি প্রদীপকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, দুটি মামলার ক্ষেত্রেই এজাহার আমলে নিয়ে আদালত বলেছেন, এ ব্যাপারে আগে কোনো মামলা হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য।

অপরদিকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার মো. ফারুক ও তাঁর ছোটভাই আজাদকে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও হত্যার অভিযোগে চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমীর আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিহতদের ছোট বোন রিনা সুলতানা শাহীন।

এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

মুছা আকবর হত্যা মামলা

নিহত মুছা আকবর হত্যা মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পুলিশ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাইঙ্গ্যা ঘোনার বাসিন্দা মুছা আকবরের বড় ভাই আলী আকবরের বাড়ি পুড়িয় দেয় টেকনাফ থানার একদল পুলিশ। পরে এ ঘটনায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করে ওই পরিবারের সদস্যরা।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৮ মার্চ রাতে মুছা আকবরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে ক্রসফায়ার না দেওয়ার কথা বলে মুছার পরিবারের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবার তখন তিন লাখ দিতে সামর্থ্য হয়। তিন লাখ টাকা নিয়েও ওই দিন ভোরে মুছা আকবরকে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ করা হয়।

মামলার পর বাদীপক্ষের আইনজীবী রিদুয়ান আলী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওই ঘটনায় থানায় এ সংক্রান্ত কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।’

সাহাব উদ্দীন হত্যা মামলা

সাহাব উদ্দীন হত্যা মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল টেকনাফ থানার এসআই দীপক বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সাহাব উদ্দীনকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ক্রসফায়ার না দেওয়ার কথা বলে তাঁর পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবার ৫০ হাজার দিতে পারে। আরো চার লাখ ৫০ হাজার টাকা না দেওয়ায় ২০ এপ্রিল রাতে কাঞ্জরপাড়া ধানক্ষেতে ক্রসফায়ারের নামে সাহাব উদ্দীনকে গুলি হত্যা করা হয়।

এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী শাহ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ফৌজদারি মামলার এজাহারটি আমলে নিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফারুক-আজাদ হত্যা মামলা

এই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১৩ জুলাই বাহারাইন ফেরত আজাদ নিখোঁজ হয়। এর দুদিন পর ১৫ জুলাই আজাদের বড় ভাই ফারুককে বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজের সামনের ভাড়া বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় চন্দনাইশ থানা পুলিশ। ওইদিন সন্ধ্যায় ফারুককে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফারুক ও আজাদের মায়ের মোবাইল ফোনে একটি নম্বর থেকে ফোন আসে। অজ্ঞাত একজন বলেন, ‘তোর দুই ছেলে আমাদের কাছে আছে। দুই ছেলেকে জীবিত ফেরত চাইলে রাতের মধ্যে আমাদের আট লাখ টাকা দিতে হবে। না হলে সকালে ছেলের লাশ পাবি। এর পরই লাইন কেটে দেওয়া হয়।’

মামলায় অভিযোগ করা হয়, গত ১৬ জুলাই ফারুক ও আজাদকে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করেন টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। চন্দনাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেশব চক্রবর্তীর যোগসাজশে এই হত্যা করা হয়।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়া আহসান হাবীব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আদালত মামলাটি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি-আনোয়ারা থানা) মর্যাদার কর্মকর্তাকে তদন্ত করে আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলায় ওসি প্রদীপসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। প্রদীপ কুমার দাশ ছাড়া এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন- টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক ইফতেখারুল ইসলাম, কনস্টেবল মাজহারুল, দ্বীন ইসলাম ও আমজাদ।

এ ছাড়া স্থানীয় চন্দনাইশ থানার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এই ঘটনায় জড়িত দাবি করে তাদের নাম তদন্তে জানা যাবে বলে মামলার এজহারে উল্লেখ করেন বাদী।

প্রদীপের বিরুদ্ধে প্রথম হত্যা মামলা

গত ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এরপর ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এতে নয়জনকে আসামি করা হয়। এটিই ছিল প্রদীপের বিরুদ্ধে প্রথম হত্যা মামলা।

দ্বিতীয় হত্যা মামলায় আসামি প্রদীপ

এরপর গত ১৮ আগস্ট চাহিদামতো ঘুষ দেওয়ার পরও এক ব্যক্তিকে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগ এনে প্রদীপ কুমার দাসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়। এই মামলাটি করেন টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভীবাজার এলাকার গুল চেহের। তিনি অভিযোগ করেছেন, পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার পরও তাঁর ছেলে সাদ্দাম হোসেনকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়। এটি ছিল প্রদীপের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় হত্যা মামলা। এই মামলায়ও প্রদীপ কুমার দাশ দুই নম্বর আসামি। মামলার ২৮ আসামির ২৭ জনই পুলিশের সদস্য।

প্রদীপের বিরুদ্ধে তৃতীয় হত্যা মামলা

গত ২৬ আগস্ট এক প্রবাসীকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার অভিযোগ এনে তাঁর ভাই কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের আদালত-৩-এ ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে আরেককটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক চন্দ্রকে প্রধান আসামি করে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাসকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এটি ছিল প্রদীপের বিরুদ্ধে তৃতীয় হত্যা মামলা।

এই মামলায় আসামি মোট ২৩ জন। নিহত প্রবাসী মাহমুদুর রহমানের ভাই নুরুল হোসাইন মামলাটি করেন। শুনানি শেষে ওই ঘটনায় অন্য কোনো হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে কি না, তা আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

চতুর্থ হত্যা মামলা

এর পরের দিন অর্থাৎ ২৭ আগস্ট টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সানোয়ারা বেগম বাদী হয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হেলাল উদ্দিনের আদালতে ১২ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। তিনি তাঁর স্বামী আব্দুল জলিলকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মসিউর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়। আসামি হিসেবে ওসি প্রদীপ কুমারের নাম রয়েছে দুই নম্বরে। এটি ছিল প্রদীপের বিরুদ্ধে চতুর্থ হত্যা মামলা।

দুই সহোদর ও ভাগনে হত্যা মামলা

তিনজনকে হত্যার দায়ে এই মামলাটি হয়েছে গত ৩১ আগস্ট। কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হেলাল উদ্দীনের আদালতে মামলাটি দায়ের করেন টেকনাফ উপজেলার রঙ্গিখালী এলাকার বাসিন্দা সুলতানা রাবিয়া মুন্নী। মামলায় ৪১ আসামির মধ্যে ৩৫ জনই পুলিশ সদস্য। ওসি প্রদীপকে মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। এটি প্রদীপের বিরুদ্ধে পঞ্চম মামলা।

মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেছেন, গত ৬ মে দিবাগত রাত ২টার দিকে তাঁর স্বামী সৈয়দ আলম, সৈয়দের ভাই নুরুল আলম এবং তাঁদের ভাগনে আনসার সদস্য সৈয়দ হোছন ওরফে আবদুল মোনাফকে ওসি প্রদীপ ও এসআই মশিউর রহমানের নেতৃত্বে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে এই তিনজনকে ‘ক্রসফায়ার’ থেকে বাঁচাতে তাঁদের পরিবারের কাছে ওসি প্রদীপ ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। টাকা না পেয়ে ওই রাতেই তিনজনকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করা হয়। তাঁদের লাশ পড়েছিল বাড়ির কাছে পাহাড়ের পদদেশে তাদেরই একটি ধানক্ষেতে। সৈয়দ হোছন ওরফে আবদুল মোনাফ নিজেকে আনসার সদস্য পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয়।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী দিদারুল মোস্তফা পরে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না এবং নিহতদের ময়নাতদন্ত হয়েছে কি না, তা আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জানাতে টেকনাফ থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন।’

একটি হত্যা মামলা খারিজ

এ ছাড়া গত ১২ আগস্ট মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নে ২০১৭ সালে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী হামিদা আক্তার (৪০) বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। এই মামলার আসামিদের মধ্যে প্রদীপ ছাড়াও আরো পাঁচজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। ঘটনার সময় প্রদীপ কুমার দাশ মহেশখালী থানার ওসি ছিলেন।

পরের দিন অর্থাৎ ১৩ আগস্ট মহেশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। তবে ওই ঘটনায় তিন বছর আগে পুলিশের দায়ের করা মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের আদেশ দিয়েছেন আদালত।