‘হরিলুটের প্রকল্প’ চায় পরিবেশ অধিদফতর!

বায়ুদূষণ, শব্দদূষণসহ দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করার কথা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদফতরের। আর এটি করতে বছর বছর প্রকল্প গ্রহণ ও শত শত কোটি টাকা এ খাতে বরাদ্দও করে সরকার। কিন্তু কাজের কাজ হয়েছে কতটুকু?

তথ্যানুযায়ী, গত কয়েকবছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম সারিতে অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকা। শব্দদূষণের মাত্রাও বেড়েছে অতিরিক্ত হারে। তাহলে পরিবেশ রক্ষায় সরকারের বরাদ্দকৃত বিপুল অঙ্কের টাকা যাচ্ছে কোথায়? কী করা হচ্ছে এই টাকায়? এমন প্রশ্ন ঘুরেফিরেই আসছে মানুষের মনে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, সুষ্ঠুভাবে বরাদ্দের টাকা যথাযথ কাজে ব্যয় করলে পরিবেশ দূষণ রোধ শতভাগ না করা গেলেও অন্তত অর্ধেকে নেমে আসত দূষণ। স্বস্তি মিলতো রাজধানীসহ গোটা দেশের নাগরিকদের। এদিকে নাগরিকদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগই লুটেপুটে খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। জনসমাগম থাকে রাজধানীর এমন কিছু স্থানে প্রকল্প বাস্তব্য়ানের সাইনবোর্ড টানিয়েই দায় সারেন কর্তাব্যাক্তিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ শীর্ষক প্রকল্পের ৩০০ কোটি টাকারই শ্রাদ্ধ হয়েছে সরকারের। বিষয়টি নিয়ে জলও কম ঘোলা হয়নি। পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহমদের কাছে বিষয়টির ব্যাখা চেয়ে তলবও করে উচ্চ আদালত। এরপরও মন ভরেনি টাকার কুমিরদের। নিজেদের পকেট আরো ভারি করতে নতুন করে হরিলুটের প্রকল্প চেয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

দেশে শব্দদূষণের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে দাবি করে ৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে সংস্থাটি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্য, এই টাকা দিয়ে দেশের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে সচেতনতা বাড়ানো এবং শব্দদূষণের কারণে স্বাস্থ্যক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা করা হবে এই টাকায়। তবে পরিকল্পনা কমিশন বুঝে ফেলেছে তাদের আসল উদ্দেশ্য। আর এই কারণেই পরিবেশ অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের প্রকল্প নিয়ে অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয় না। সভা- সেমিনারের নামে অর্থ লোপাট হয়, কিন্তু পরিবেশের কোনো উপকারে আসে না।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই ১৯৭২ সালে স্টকহোমে জাতিসংঘ আয়োজিত মানব পরিবেশের ওপর অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয় রোধে সরকারি ও বেসরকারি র্পযায়ে উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওই প্রস্তবে সাড়া দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে তৎকালীন জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগের অধীনে পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করনে। পরে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারির পাশাপাশি পরবিশে দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গঠণ করে। এ ধারাবাহকিতায় ১৯৭৮ সালে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ সেল গঠন করা হয়। ১৯৮৫ সালে প্রতিশ্ঠিত হয় পরিবেশ দূসণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, যা পরে ১৯৮৯ সালে পরিবেশ অধিদফতরে রূপান্তরিত হয়। লক্ষ্য একটিই, পরিবেশগত ঝুঁকি ও দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের বর্মমান পদস্থরা সেই লক্ষ্য থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের পকেট ভারি করতে নির্ধারিত প্রকল্পের টাকা লুটের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প প্রস্তাবনাও পাঠাচ্ছেন।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যানুযায়ী, এর আগেও পরিবেশ উন্নয়নের নামে একাধিক প্রকল্পে অর্থ অপচয়ের কথা শোনা গেছে। এসব প্রকল্পের আওতায় অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু পরিবেশের কী উপকার হয়েছে তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা ও গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত কাজ। এ ধরনের কাজের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় না। এ ধরনের কার্যাবলির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। প্রকল্পের আওতায় এ ধরনের কাজ করা হলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পরে কীভাবে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যক্ষতি নিরূপণ করার দায়িত্ব জনস্বাস্থ্য অধিপ্তরের।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও এই প্রকল্প একবার পাঠানো হয়েছিল। প্রয়োজন নেই বলে ফেরত পাঠায় পরিকল্পনা কমিশন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই আবারও এই প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর প্রস্তাবিত ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্প প্রস্তাবনা) থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে জুন ২০২২ সালে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় সুনির্দিষ্ট কাজগুলো হচ্ছে- শব্দদূষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিকরণ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল তৈরি, শব্দদূষণের কারণে স্বাস্থ্যক্ষতি নিরূপণ, জেলা শহরগুলোর শব্দের মাত্রা নিরূপণ সাপেক্ষে প্রাথমিক তথ্যভান্ডার তৈরি, বিভাগীয় শহরসমূহে ইতিপূর্বে জরিপকৃত ফলাফলের সঙ্গে নতুন জরিপ ফলাফলের তুলনামূলক চিত্র প্রণয়ন, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী উপায় উদ্ভাবন করা, আইন ও বিধিমালা হালনাগাদ করা, অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিধিমালা বাস্তবায়নে দৃষ্টান্ত তৈরি করা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জন্য ইতোমধ্যে মধ্যমেয়াদি একটি কৌশলপত্র রয়েছে। যার আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হলো শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা। প্রস্তাবিত প্রকল্পে শব্দদূষণ হ্রাসে সচেতনতার বিষয়টি প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে ধরা হয়েছে। এজন্য এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলে কাজের দ্বৈততা সৃষ্টি হবে। যা পরিহার করা সমীচীন। প্রকল্পের ডিপিপিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষক, চালক, নির্মাণ ও কারখানা শ্রমিক, ইমাম এবং সাংবাদিকদের সচেতন করে তোলার বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণ প্রদানের পর তারা কীভাবে তাদের জ্ঞানকে কাজে লাগাবে, কারা এ প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবীব এ বিষয়ে বলেন, ‘পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে এই ধরনের সচেতনতামূলক কর্মকান্ড গ্রহণ করে দূষণ কমানো যাবে না। পরিবেশ আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে, কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে। এছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা তৈরি অধিদপ্তরের নিয়মিত কাজ। তারপরও এই ধরনের প্রকল্প গ্রহণ দ্বৈততা ছাড়া আর কিছু নয়।

এদিকে পরিবেশ অধিদফতরের ওপর করা মহাহিসাব নীরিক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের একটি অডিট রিপোর্ট মানবকণ্ঠের হাতে রয়েছে। এতে বলা হয়েছে- এয়ার কোয়ালিটি প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহীত পদক্ষেপ সমূহের কোন দৃশ্যমাননফলাফল দেখা যায়না। ঢাকা শহর সংলগ্ন নদীর দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। গৃহীত প্রকল্প সমূহের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। সীমিত প্রকল্প সম্পদের ব্যবহার করা হয়নি। যথাযথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করায় অনেক সময় প্রকল্পের অর্থ ফেরৎ দিতে হয়েছে; যা দেশের ভাবমূর্তীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ ব্যাপারে জানতে বেশ কয়েকদিন ধরে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহমদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান এবিষয়ে মানবকণ্ঠকে বলেন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ কিংবা টাকা লোপাটের প্রকল্প কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবেনা। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।