ফের রুদ্ররূপে যমুনা

চলতি মৌসুমে চতুর্থবারের মতো যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এনায়েতপুর এবং চৌহালী উপজেলার নদীতীরবর্তী অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে।

গত পাঁচ দিন ধরে যমুনা নদীতে অব্যাহত পানি বৃদ্ধির পর রবিবার পানি কিছুটা থমকে রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই নদীতীরবর্তী অঞ্চলে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। বিশেষ করে এনায়েতপুর থানার দক্ষিণ অঞ্চলে শুরু হয়েছে ব্যাপক নদীভাঙন। অসময়ে যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ৩ দিনে এনায়েতপুরের দক্ষিণ অংশের প্রায় ৬০টি বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী আক্ষেপ করে বলেন ‘নদীতে সর্বস্ব বিলীন হয়ে গেলে বছরের পর বছর অপেক্ষা করা সাড়ে ৬ শ কোটি টাকার প্রকল্প দিয়ে কি লাভ হবে’?

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী জানান, এ বছর যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধির পরে এবং আগে দফায় দফায় ভাঙনের কবলে বিলীন হয়েছে এনায়েতপুর দক্ষিণের শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। একই চিত্র ছিল যমুনার পূর্বপাড় চৌহালী উপজেলার খাসপুকুরিয়া থেকে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনুনিয়া গ্রাম পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। গত মঙ্গলবার তাঁত ও চিকিৎসাসেবা সমৃদ্ধ এনায়েতপুর থানার আরকান্দি, বাঐখোলা, ঘাটাবাড়ী ও পাকুরতলা এলাকায় নতুন করে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে নদীতে বিলীন হয়েছে অন্তত ৬০টি বসতভিটা কয়েক শ একর আবাদি জমি। ভাঙনের হাত থেকে রেহাই মিলছে না পাকুরতলা হাফিজিয়া মাদরাসা ও মসজিদ।

এদিকে অব্যাহত ভাঙনে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে চৌহালী উপজেলায় রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এনায়েতপুর কাপড়ের হাট, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সিং ইনস্টিটিউট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, অসংখ্য তাঁত কারখানাসহ হাট-বাজার ও নানা স্থাপনা। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষায় জরুরিভাবে তীর সংরক্ষণ কাজ শুরু করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে জানালেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পাকুরতলা গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল আজিজ জানান শুধুমাত্র সঠিক পরিকল্পনা আর তদারকির অভাবে এই এলাকার ভাঙন থামছে না। প্রতিবছরই নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো মানুষ। একই গ্রামের আব্দুল আজিজ, সোবাহান মিয়া ও মুসলিম উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার সকালে চোখের সামনে আমরা আমাদের ঘরবাড়ি আর বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখেছি। দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি আমাদের এই এলাকায় স্থায়ী বাঁধ হবে। কিন্তু কবে হবে তা জানি না। বাড়িঘর বসতভিটা সর্বস্ব হারানোর পরে এই বাঁধ দিয়ে আমাদের আর কি লাভ?

গ্রামের সেলিম মিয়া জানান, ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত কাজ শুরু না করলে জেলার দক্ষিণ জনপদের এই অংশটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন জানান, যমুনার ভাঙনরোধে টেকসই স্থায়ী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণে জরুরিভাবে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে একদিকে যেমন নদী শাসন হবে সেইসাথে রক্ষা পাবে নদী পাড়ের মানুষেরা। তিনি তাঁতশিল্পসমদ্ধ এনায়তপুর থানাকে রক্ষায় দ্রুত তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

সিরাজগঞ্জ পানি উনয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানান, ভাঙনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহল অবগত আছে। এ ছাড়া এনায়তপুরে সাড়ে ৬ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণে প্রায় সাড় ৬ শ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হবে।