পাহাড়ি সড়কে এক টুকরো স্বস্তি

চট্টগ্রাম শহরের ঠিক পাশেই ছোট-বড় সারি সারি উঁচু-নিচু পাহাড়- সবুজের বিপুল সমারোহ। পাশাপাশি লেক ও ছড়ার মেলবন্ধনে ছড়িয়ে আছে নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্য। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের নতুন বিনোদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বায়েজিদ-ফৌজদার লিংক রোডের এই স্থান। পাহাড়ঘেরা এই সড়কটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পর তা হয়ে উঠেছে এক টুকরো স্বস্তির স্থান। নগরের একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিনই সেখানে ছুটে যাচ্ছেন নগরবাসী।
কথা হয় চট্টগ্রামের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসায়ী ডি জে কে জামালের সঙ্গে। একাধিকবার বন্ধুদের নিয়ে সেখানে ঘুরতে গেছেন তিনি। দিয়েছেন আড্ডা, খুঁজে নিয়েছেন প্রশান্তি। গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন নয়নাভিরাম সড়কটির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ছবি তুলে পোস্ট করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সমকালকে তিনি বলেন, অনেক সুন্দর, মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সেখানে। দু’পাশে পাহাড় আর পাহাড়। মাঝখান দিয়ে একটি সড়ক। সময় পেলেই আড্ডা দিতে চলে যাই সেখানে।
এ সড়কে বেশ কয়েকবার ঘুরতে গেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রকৌশলী এনামুল হকও। তিনি বলেন, করোনাকালের একঘেয়েমি কাটাতে বেশ কয়েকবার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে গিয়েছি সেখানে। সড়কের দু’পাশেই খাড়া পাহাড়, সবুজ গাছগাছালি, ছড়ার ওপর সেতু- সব মিলিয়ে অতুলনীয় এর সৌন্দর্য। আমাদের মতো বহু মানুষকে বিকেলে ঘুরতে, আড্ডা দিতে ও সময় কাটাতে দেখেছি সেখানে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, শত শত দর্শনার্থী এসেছে লিংক রোডে। কেউ এসেছে বন্ধুর বাইকে চড়ে। কেউ এসেছে অটোরিকশায়।
ব্যক্তিগত গাড়িতেও অনেককে পরিবার নিয়ে আসতে দেখা গেছে। সড়কের পাশে বসে আড্ডায় মেতে ওঠে বহু মানুষ। কেউ ছুটে যায় পাহাড়ের কোলে, কেউ উঠে পড়ে উঁচু পাহাড়ের ওপর। সেঁজুতি নামে এক গৃহিণী তার পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে ঘুরতে আসেন। গাড়ি থেকে নেমেই সেলফি তুলতে উঁচু পাহাড়ের ওপর উঠে যান। সেখানে মেয়ে নাজু সেলফিতে এক ফ্রেমে বন্দি করেন মা, ভাই ও বোনদের। অনেককে আবার দেখা যায় পাহাড়ের পাদদেশে থাকা কাশফুলের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলতে। সড়কে প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থী হওয়ায় সেখানে ভাসমান দোকানও বাড়ছে দিন দিন। সড়কের পাশে পাহাড়ের ঢালে বসে চা, ফুচকা এবং চটপটি খেতে খেতে আনন্দ আড্ডা ও খোশগল্পে মেতে ওঠে সব বয়সের দর্শনার্থী। নাজমুল নামের এক তরুণ বলেন, অনেক দিন পর শুক্রবার ছুটির দিনে তিন বন্ধু ও দুই বান্ধবী মিলে এখানে ঘুরতে এসেছি। জায়গাটা এত সুন্দর যে, মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে।
সরেজমিন আরও দেখা যায়, সৌন্দর্য ও প্রশান্তি আছে বলেই ইদানীং উটকো নানা ঝামেলাও তৈরি হচ্ছে সেখানে। অনেক তরুণই টিকটক ভিডিও বানাতে বায়েজিদ লিংক রোডকে বেছে নিচ্ছেন। তরুণদের কেউ মোটরসাইকেলের ওপর শুয়ে, কেউ রাস্তার মাঝখানে বসে নানা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। কোনো কোনো তরুণ বাইকার বেপরোয়া গতিতে ছোটাছুটি করছে সড়কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। রাস্তার পাশে পার্ক করা সারি সারি গাড়িকে কিংবা চলমান অন্যান্য যানবাহনকে পাত্তাই দিচ্ছে না তারা।
কথা হয় খুলশী থেকে আসা কিশোর রাফসানের সঙ্গে। সে বলে, পাহাড়, লেক ও সবুজের এমন ছড়াছড়ি আশপাশের আর কোনো সড়কে নেই। এখানকার শ্যাওলায় ঢাকা পাহাড়ও অসাধারণ। তাই টিকটকের ভিডিওর জন্য এ জায়গাটাকে বেছে নিয়েছি। টিকটকে পপুলারিটি পেতে হলে ব্যতিক্রমী কিছু দেখাতে হয়। এখানে সেই চেষ্টাই করছি।
চট্টগ্রাম মহানগরের ভেতর যানজট কমাতে ১৯৯৭ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। ৩৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি ১৯৯৯ সালে একনেকে পাস হয়। ২০০৪ সালে ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে ফৌজদারহাট থেকে কাজ শুরু হয়। পরে ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি তৈরি করা হয়। সড়কটিতে একটি রেলওয়ে ওভারব্রিজ, লেক ও ছড়ায় ছয়টি ব্রিজ ও কয়েকটি কালভার্ট রয়েছে।
চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাস বলেন, পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় প্রচুর মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। এ জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ এখনও চলছে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ইদ্রিস আলী বলেন, এ রকম পাহাড়ি নৈসর্গিক পরিবেশে সময় কাটালে মানুষ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে সবকিছুই হতে হবে পরিবেশকে রক্ষা করে।