দগ্ধ ২১ জনের মৃত্যু, অন্যরাও সংকটে

‘মা, আমরা নামাজে যাচ্ছি, এসে ভাত খাব’, এই বলে তিন ভাই বাসা থেকে বের হয়। বায়তুস সালাত জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় তারা, কিন্তু তিন ভাইয়ের মধ্যে সাব্বির (২১) ও জুবায়ের (১৮) আর ফিরে আসেননি। মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় তাঁরা চিরতরে চলে গেছেন। আর ভাত খেতে ফিরবেন না। ছোট ভাই ইয়াসিন ফরজ নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় বেঁচে গেছে।

দুই ছেলের মৃত্যুর খবর জানতে পেরে বাবা নূর উদ্দিন ও মা কুলসুম বেগম এখন পাগলপ্রায়। গতকাল শনিবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সন্তানদের লাশের পাশে চিৎকার করে কাঁদছিলেন তাঁরা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কুলসুম বেগম এ প্রতিবেদক বলছিলেন, ‘খোদা তিন ছেলে দিয়েছিলে। বড় দুইডারে নিয়া গেল। এহন আমি কী নিয়ে বাঁচব?’ নূর উদ্দিন বলছিলেন, ‘বড় ছেলে সাব্বির বিএ পাস করেছে। মেজো ছেলে জুবায়ের তোলারাম ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি শিক্ষার্থী। এখন থাকল শুধু ছোট ছেলে ইয়াসিন (৬)। অনেক কষ্টে ছোট চাকরি করে খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম, কিন্তু একি হলো।’ এ কথা বলে আর্তনাদ করতে থাকেন তিনি।

শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের ভেতর-বাইরে গতকাল সকাল থেকে দেখা যায় এমন হৃদয়বিদারক চিত্র। স্বজনহারাদের আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। হাসপাতালের বাইরের দেয়ালে গ্রিল ধরে প্রিয়জনের অবস্থা জানার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন শতাধিক স্বজন।

গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ পড়ার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে এসেছিলেন। ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার সময় তাঁদের অনেকেই মসজিদে ছিলেন। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ গুরুতর অগ্নিদগ্ধ ৩৭ জনকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের মধ্যে গত রাত ১০টা পর্যন্ত ২১ জন মারা গেছেন। বাকিদের অবস্থা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।

ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এখন ১৬ জন চিকিৎসাধীন। প্রায় সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিন : নিহত দুই ভাই সাব্বির ও জুবায়েরের মা কুলসুম বেগম বলছিলেন, ঘটনার আধাঘণ্টা পর ছোট ছেলে ইয়াসিন দৌড়ে বাসায় ফিরে তাঁকে খবর দেয় যে মসজিদে আগুন ধরেছে। এ খবরে তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। দৌড়ে মসজিদে গিয়ে জানতে পারেন, অনেক মুসল্লি আগুনে পুড়েছে। পাগলের মতো সন্তানদের খুঁজতে থাকেন তিনি, কিন্তু মসজিদের কোথাও ছেলেদের পাননি। একপর্যায়ে লোকমুখে জানতে পারেন, দুই সন্তানকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। ছুটে আসেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সারা রাত অপেক্ষা শেষে সকালে জানতে পারেন, তাঁদের দুই সন্তান চিরদিনের জন্য না-ফেরার দেশে চলে গেছেন।

শুধু সাব্বির ও জুবায়ের নন, মসজিদটির মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর ছেলে জুনায়েদের মৃত্যু হয়েছে এই আগুনে। তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে। স্বজনরা জানিয়েছেন, ছেলে দুই দিন আগে বাবার কাছে বেড়াতে এসেছিল। ঘটনার দিন বাবার সঙ্গে নামাজ পড়তে গিয়ে দুজনেরই মৃত্যু হয়।

স্বামী ইব্রাহিমের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আহাজারি করছিলেন স্ত্রী নাছিমা। বলছিলেন, ‘স্বামী ছাড়া কিভাবে বাঁচব আমি।’ তাঁর পাশেই, স্বামী জামাল হোসেনের লাশ সামনে রেখে স্ত্রী শাহিনা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। রাসেলের লাশের পাশে বোন সুমাইয়া ও চাচির আর্তনাদ আর আহজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এইচএসসি পড়ুয়া নিহত রিফাতের বাবা আনোয়ার হোসেন পুড়ে যাওয়া ছেলেটিকে একটিবার দেখতে কলেজ আইডি নিয়ে সবার কাছে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। ছেলের লাশের অপেক্ষায় থাকা রিকশাচালক আনোয়ার আহাজারি করছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘এই যে আমার বাবা। আমার বাবাডারে ফিরাইয়া দাও।’ বার্ন ইনস্টিটিউটের লিফটের পাশে দেয়াল ধরে কাঁদছিলেন চাঁদপুরের মোস্তফা কামালের সত্তরোর্ধ্ব বাবা করিম মিজি। বলছিলেন, ‘আমার ছেলে লকডাউনে চার মাস বাড়িতে ছিল। অনেক দিন ধরে চাকরি না পেয়ে ১৫ দিন আগে নারায়ণগঞ্জ এসে ছেলেপেলে পড়াত।’

একমাত্র সন্তানের লাশ নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা মা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমার বুকের ধন আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেল! আমার সোনার সংসার তছনছ হয়ে গেল।’ নিহত রাসেল সব সময় এলাকার বড় মসজিদে নামাজ পড়লেও করোনার কারণে পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত মসজিদে নামাজ পড়তে এসে প্রাণ হারান। হাসপাতালের নিচতলার অভ্যর্থনা কক্ষের সামনে তাঁর বোন সুমাইয়ার আর্তনাদ থামছিল না।

‘মা, টিভি বন্ধ কোরো না’, বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় জুয়েল। সাত বছরের শিশুটি বাবার সঙ্গে বাড়ির কাছের মসজিদে যাবে নামাজ আদায়ে। ফিরে এসে আবার বসে যাবে টিভির সামনে। তাই টিভি বন্ধ করেননি মা। মিনিট বিশেক পরই মা জানতে পারেন সেই হৃদয়বিদারী খবর, তাঁর নাড়িছেঁড়া বুকের মানিক আর টিভি দেখতে আসবে না। একমাত্র সন্তান কখনোই আর ফিরবে না বাসায়।

মৃত্যু বেড়ে ২১ : মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় ২১ জন মারা গেছেন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত মারা যান ১৪ জন। এরপর রাত ৮টা পর্যন্ত মৃত্যু বেড়ে হয় ২০ জন। রাত ১০টার দিকে আরেকজনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে সাতজনের শরীরের ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। আর একজনের শরীরের শতভাগই পুড়ে গেছে। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছেন মসজিদের মোয়াজ্জিন কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দেলোয়ার হোসেন (৪৮) ও তাঁর ছেলে জুনায়েদ (১৭), নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকার দুই ভাই জোবায়ের (১৮) ও সাব্বির (২১), মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হাটবুকদিয়া গ্রামের কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), চাঁদপুর সদর উপজেলার করিম মিজির ছেলে মোস্তফা কামাল (৩৪), পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আব্দুল খালেক হাওলাদারের ছেলে গার্মেন্টকর্মী রাশেদ (৩০), নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকার হুমায়ুন কবির (৭২), পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর জামাল (৪০), গার্মেন্টকর্মী ইব্রাহিম বিশ্বাস (৪৩), নারায়ণগঞ্জের নিউ খানপুর ব্যাংক কলোনির কলেজশিক্ষার্থী মো. রিফাত (১৮), চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার শেখদী গ্রামের মৃত মহসিনের ছেলে মাইনুউদ্দিন (১২), ফতুল্লার আনোয়ার হোসেনের ছেলে জয়নাল (৫০), লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তালুক পলাশী গ্রামের গার্মেন্টকর্মী নয়ন (২৭), নারায়ণগঞ্জের রাসেল (৩৪), খুলনার কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জুলহাস ফরাজির ছেলে জুয়েল (৭), ফতুল্লার আব্দুল খালেকের ছেলে বাহারউদ্দিন (৫৫), মসজিদের ইমাম আবদুল মালেক (৬০), মিজান (৩৪) ও নাদিম (৪৫)।

আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন যাঁরা : বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ফরিদ (৫৫), শেখ ফরিদ (২১), মনির (৩০), আবুল বাসার মোল্লা (৫১), শামীম হাসান (৪৫), মো. আলী মাস্টার (৫৫), মো. কেনান (২৪), নজরুল ইসলাম (৫০), আব্দুল আজিজ (৪০), হান্নান (৫০), আব্দুস সাত্তার (৪০), জুলহাস উদ্দিন (৩০), আমজাদ (৩৭), মামুন (২৩) ও ইমরান (৩০)।

ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, যাঁরা ভর্তি আছেন তাঁদের অবস্থাও জটিল। অনেকেরই শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ বলা যায়।

দগ্ধদের সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক, পরিচালক ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাঁরা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দেন।

মসজিদের ছয়টি এসিই পুড়ে গেছে : গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে দগ্ধদের দেখতে এসে নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জায়েদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাঁদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। পাশাপাশি মরদেহ দাফনের জন্য তাঁদের বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মসজিদে মোট ছয়টি এসি ছিল। আগুনে সব এসিই বিস্ফোরিত হয়। এতে মসজিদের সব জানালার কাচ ভেঙে যায়।

এসপি বলেন, মসজিদে কী কারণে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটল, সেটি বের করার চেষ্টা চলছে। এদিকে মসজিদের মেঝের নিচে তিতাসের গ্যাসের লাইন রয়েছে বলে জানা গেছে। এ মুহূর্তে বিস্ফোরণের সঠিক কারণ বলা যাচ্ছে না। এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩০৪ ধারায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানান এসপি জায়েদুল।

ঘটনা তদন্তে কমিটি : ঘটনা তদন্তের জন্য আলাদা করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস, তিতাস গ্যাস ও জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের কমিটিতে আছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ), তিতাস গ্যাস, বিদ্যুৎ বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একজন স্টেশন অফিসার।

৬ জনের জানাজা সম্পন্ন : মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত ২১ জনের মধ্যে ছয়জনের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বিকেল ও সন্ধ্যায় ফতুল্লা থানার পশ্চিম তল্লার বড় মসজিদ, তল্লা চেয়ারম্যান বাড়ি মসজিদ ও বাইতুস সালাত জামে মসজিদের পাশের বোমওয়ালা বাড়ির মাঠে জানাজা শেষে কয়েকজনকে মাসদাইর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ছাড়া কয়েকজনকে তাদের গ্রামের বাড়ি নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়েছে।

মামলা দায়ের : ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মো. আসলাম হোসেন জানান, পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় গতকাল বিকেলে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় স্থানীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস অফিসের কর্মকর্তাসহ মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ আনা হয়েছে।