ই-কমার্সের মতো উদীয়মান সেক্টরকে ধ্বংস করছে কারা?

ই-কমার্স বর্তমানে একটি উদীয়মান ব্যবসায়িক সেক্টর। এর মাধ্যমে ক্রেতা যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে পণ্য সংগ্রহ করতে পারে, তেমনি বিক্রেতাও খুব সহজে বেশি পরিমাণ পণ্য বিক্রি করতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বে অধিকাংশ পণ্য ডেলিভারি ই-কমার্সের মাধ্যমে হওয়ার অন্যতম প্রমাণ হল, অ্যামাজনের মালিকের ২০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদের ক্লাবে প্রবেশ। অত্যাধুনিক এ সভ্যতার মানুষ এখন আর হাতে ব্যাগ নিয়ে বাজারে গিয়ে দরদাম করে পণ্য কেনার মতো মানসিকতার অনেকটাই পরিবর্তন করতে পেরেছে। যদিও এর অন্যতম কারণ ‘সময়’।

মানুষের হাতে এখন আর আগের মতো অঢেল সময় থাকে না বাজার করা কিংবা পণ্য সংগ্রহ করার। মানুষ ঘরে বসে তার চাহিদামতো পণ্য পেলে বাইরে বের হওয়ার ইচ্ছাটা অবশ্যই কমিয়ে ফেলতে পারে। বাংলাদেশে যতগুলো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধেই রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

কয়েকদিন আগে দেখলাম- একটি প্রতিষ্ঠানের শাখা থেকে টাকাসহ কয়েকজনকে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটি সত্যিই লজ্জা ও উদ্বেগের বিষয়। একটি উদীয়মান সেক্টর, যার হাত ধরে আমার ‘সোনার বাংলা’র মানুষের জীবন ও জীবিকার চেহারা পরিবর্তন হওয়ার কথা; সেই সেক্টরই কিনা খাদের কিনারায়! বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

অনলাইন প্লাটফরমের বিরুদ্ধে অন্য কোনো দেশে হয়তো বাংলাদেশের মতো এত অভিযোগ নেই (থাকলেও আমার জানা নেই)। এবার আসা যাক বাস্তব অভিজ্ঞতার কথায়। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য বই বিক্রয়কারী অনলাইন প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি বইয়ের অর্ডার করেছিলাম। টাকাটাও পেমেন্ট করেছিলাম তাদের প্রদত্ত মার্চেন্ট নাম্বারে বিকাশের মাধ্যমে। কিছুদিন কেটে গেলেও কাঙ্ক্ষিত বইটি হাতে পাচ্ছিলাম না। অগত্যা তাদের হেল্পলাইনে ফোন দিলাম। তারা আমার বিস্তারিত তথ্য নিল। এমন কী বিকাশের ট্রানজেকশন নাম্বার/আইডি পর্যন্ত নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি তারা আমাকে জানাবে বলে কথা দিয়েছিল। কিন্তু তারা তাদের কথা রাখেননি। আমি আবারও আমার মোবাইলের টাকা খরচ করে তাদের ফোন দেই। তৎক্ষণাৎ ওই কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি আমাকে জানান যে, তার কাছে আমার ট্রানজেকশনের কোনো তথ্য নেই। তিনি আমাকে বিকাশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিলেন। আমি বিকাশের নাম্বারে ফোন দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।

বইয়ের দামের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন কাস্টমার কেয়ারের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে শেষ করে অবশেষে ক্ষান্ত হলাম। চিন্তা করলাম, প্রতিকার চাওয়ার চেয়ে যদি চুপ করে থেকে খরচ কম হয়, তাই শ্রেয়। প্রশ্ন হল, বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্টের টাকাটা গেল কোথায়? পরবর্তীকালে আমি দৃঢ়চিত্তে পণ করলাম- স্বজ্ঞানে কোনো অনলাইন প্লাটফর্মে অর্ডার করব না। তাহলে আমার মতো একজন ক্রেতা হারানোর পেছনে কে বা কারা দায়ী?

হয়তো আমার মতো একজন কাস্টমার তাদের কাছে কিছুই না, কিন্তু সামগ্রিক অনলাইন মার্কেটের জন্য এটা কম ক্ষতিকর নয়। কারণ আমি যদি আমার জীবনের প্রথম অর্ডারটা ঠিকমতো পেতাম, তাহলে হয়তো আরও অনেক পণ্যই এতদিনে কিনতাম। এ আস্থাহীনতা কে বা কারা তৈরি করল? তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এ দেশে হয়তো অনলাইন প্লাটফর্মগুলোকে মাথা তুলে দাঁড়ানো অনেক কষ্টকর হবে।

আমার জানা আরেকটি ঘটনা বলছি- পাশের বাসার এক ছোট ভাই অনলাইন প্লাটফর্মে একটি চেয়ার অর্ডার দিয়ে সেটি হাতে পাওয়ার পর অবাক। সে নিজে বসার জন্য চেয়ার অর্ডার দিলেও পেয়েছে প্লাস্টিকের খেলনা চেয়ার। দাম কিন্তু নিয়েছে বেশ ভলোই।

যদিও এ দোষটা সম্পূর্ণ অর্ডার প্রদানকারীরই বলা যায়। সে হয়তো না দেখে অর্ডার দিয়েছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোকে আরও বেশি সতর্ক হয়ে পণ্য প্রদর্শন করা উচিত, যেন ক্রেতা পণ্য সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে পারে।

এবার আসা যাক ভিন্ন অভিজ্ঞতায়। আমি ২০২০ সালের শুরুর দিকে ভারত গিয়েছিলাম চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসাজনিত কারণে সেখানে আমাকে প্রায় ১৫ দিন অবস্থান করতে হয়। আমার এক বড় ভাই (সহকর্মী) ফোনে আমার হোটেলের অবস্থান জেনে নিয়ে আমার ঠিকানায় অনলাইনে একটি পণ্য অর্ডার করেন। পণ্যটির মূল্য ৭৫০ রুপি মাত্র। যথাসময়ে পণ্যটি নিয়ে ডেলিভারি বয় আমার হোটেলে পৌঁছায়। আমি তখন ঘুমিয়েছিলাম।

সে আমার ফোনে চারবার কল দিয়ে আমাকে না পেয়ে হোটেলের ওয়েটিং রুমে প্রায় ১ ঘণ্টা বসেছিল। পরে ঘুম থেকে জাগার সঙ্গে সঙ্গে তাকে আমি ফোন দিই এবং সে জানায় যে, সে হোটেলের ওয়েটিং রুমে আছে। আমি গিয়ে প্রথমে তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করি। তাকে বলি, ওষুধ সেবনের কারণে আমার শরীরটা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেও যথারীতি আমাকে বারবার ফোন দেয়ার কারণে স্যরি বলল।

আমি পণ্যটি গ্রহণ করি এবং কৌতূহলী হয়ে তার কাছে জানতে চাই- দীর্ঘ সময় বসে না থেকে তিনি তো চলেও যেতে পারতেন; কিন্তু কেন গেলেন না? সে মুচকি হেসে বলল, ‘আমি হয়তো এখন চলে যেতে পারতাম।

এতে হয়তো আমার সময় কিছুটা বাঁচত; কিন্তু আপনি যদি অনলাইনে এ বিষয়ে রিপোর্ট করতেন, তাহলে আমাকে জবাবদিহি করতে হতো এবং সর্বোপরি এভাবে আমরা আপনার মতো একজন সম্মানিত কাস্টমার হারাতাম’ (যদিও আমি সম্মানিত কোনো ব্যক্তি নই)। আমি অবাক হলাম। তারা সামান্য কিছু টাকার একটা অর্ডারটাকে এতটা সিরিয়াসলি নিয়েছে দেখে!

এ জন্যই হয়তো ভারতের সর্বত্রই অনলাইন মার্কেটগুলোর চাহিদা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাদের দায়িত্ববোধ যাচাই করার জন্য পরবর্তী সময়ে আমি সেখানে বসেই ১৮৫ রুপি মূল্যের একটি বই অর্ডার দেই। কিন্তু অবাক করার বিষয় হল, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তারা আমাকে বইটি পৌঁছে দেয়। বিষয়টি সত্যিই আমার কাছে দারুণ লেগেছে। আগামীতে চিকিৎসার জন্য হয়তো আবারও আমাকে ভারত যেতে হবে এবং আমি ইতোমধ্যে আরও বেশি পরিমাণ পণ্য অনলাইনে কেনার মানসিকতা তৈরি করে রেখেছি।

ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন অনলাইনে পণ্য কেনা সম্ভব। এগুলো তৈরি করেছে ভারতের অনলাইন প্লাটফর্মগুলো- এগুলো আমার ব্যক্তিগত মতামত, যা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। এখানে তাদের গুণগান বা গুণকীর্তন করার কোনো কারণ নেই এবং এজন্য আমার বিন্দুমাত্র লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

দেশের অনলাইন মার্কেটগুলোর জন্য কিছু করণীয়, যা পালন করলে হয়তো আমার মতো কাস্টমার পুনরায় আস্থা ফিরে পাবে। যেমন-

১. প্রতিটি লেনদেনকে আলাদা আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমে তাদের লাভের থেকে কাস্টমার সন্তুষ্টির প্রতি নজর দিতে হবে। কাস্টমার সন্তুষ্ট থাকলে পণ্যের বিক্রি বাড়বে।

২. অনলাইনে পণ্য প্রদর্শনের সময় অতিরঞ্জিত না করা। সঠিক কালার, সঠিক সাইজ ও গুণগত মান সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য প্রদর্শন করতে হবে।

৩. পেমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে অনলাইন ট্রানজেকশনগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। কাস্টমার যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয়। এ ক্ষেত্রে বিকাশ, রকেট বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। কোনো ট্রানজেকশন ফেইল করলে সঙ্গে সঙ্গে কাস্টমারকে অবহিত করতে হবে এবং তার অর্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

৪. প্রতিটি অনলাইন প্লাটফর্মকে টোল ফ্রি নাম্বার চালু করতে হবে- কাস্টমার যেন তাদের ছোটখাটো অভিযোগও জানাতে পারে। প্রাপ্ত অভিযোগগুলো দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং অভিযোগকারীকে অবহিত করতে হবে। এতে কাস্টমারের সঙ্গে অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর সুসম্পর্ক তৈরি হবে। এর ফলে পরোক্ষভাবে অনলাইন মার্কেটগুলোই লাভবান হবে।

৫. সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গোপনীয়তা ও দ্রুততা- পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এসব নীতির সঠিক প্রয়োগ হলে বাংলাদেশে অনলাইন মার্কেটগুলো খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে আশা করি।

দেশের অনলাইন মার্কেটের কাস্টমারের জন্য কিছু করণীয়-

১. অনলাইন মার্কেটের জন্য যেসব সংবাদ নেতিবাচক, তা যাচাই-বাছাই করে যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা। নেতিবাচক খবরের ফলে মানুষের মধ্যে এ মার্কেট সম্পর্কে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে মার্কেটগুলো তাদের পণ্যের অর্ডার কম পায় এবং ধীরে ধীরে মার্কেটগুলো ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।

২. পণ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা নিয়ে অর্ডার করা। পণ্যের সাইজ, কালার, ওজন এবং এর মান সম্পর্কে জেনে তারপর অর্ডার করা। কোনো পণ্যের অর্ডারের সময় তাড়াহুড়া না করে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে অর্ডার করুন।

৩. নিজে ভালো পণ্যের অর্ডার দিন এবং বন্ধুবান্ধবকে কিনতে উৎসাহ দিন।

৪. প্রতিষ্ঠিত অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে পণ্য সংগ্রহ করুন। পণ্য সংগ্রহের আগে পণ্যপ্রাপ্তির পদ্ধতি যাচাই করুন। কোনো ধরনের সন্দেহ হলে দ্বিতীয়বার যাচাই করুন।

৫. পজিটিভ ভাবনার গুরুত্ব দিন, নেগেটিভ চিন্তাকে বারবার পরখ করুন। এ দেশে নেগেটিভ ভাবনা আসাটাই স্বাভাবিক; তবে সবাই প্রতারক নয়- এটাও মাথায় রাখতে হবে। অনলাইন মার্কেটগুলো নিয়ে উপরোক্ত মতামতগুলো সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত। কোনো মার্কেটের প্রতি আমার বিদ্বেষ বা বিশেষ টান নেই। তবে আমি চাই, এ দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ুক অনলাইন মার্কেটের কার্যক্রম। পরিশেষে সব অনলাইন মার্কেটের উত্তরোত্তর ব্যবসায়িক সাফল্য ও সেবামানের উন্নয়ন কামনা করছি।

সরকারি চাকরিজীবী, কেওড়াবুনিয়া, আশাখালী, বরগুনা